সিয়াম সাধনার মাস পার করে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঈদ এক বিশেষ উপহার ও আনন্দের দিন হিসেবে আসে। ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই প্রশান্তি। কিন্তু আমরা অনেকেই ঈদের আনন্দে এতটাই মগ্ন হয়ে যাই যে, ঈদের রাতের গুরুত্বপূর্ণ আমল করতে বেমালুম ভুলে যাই। এতে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি হয় তা হলো—বরকতময় সময় নষ্ট এবং গুনাহ মাফের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। অথচ এই রাতের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলত। ঈদের রাতের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো—এ রাতে দোয়া কবুল করা হয়। কোনো দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না; বরং আল্লাহ তায়ালার দরবারে তা সরাসরি কবুল হয়।

শাওয়াল মাসের চাঁদ উদিত হওয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয় এই মহামহিমান্বিত রাত। এটি শুধুই উৎসবের প্রস্তুতির জন্য নয়, বরং আল্লাহর অসীম দয়ার স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে তাঁর নৈকট্য লাভের এক মোক্ষম সুযোগ। এ রাতে আসমানের সব দরজা খুলে দেওয়া হয়, রহমতের নূর বর্ষিত হয়, আর বান্দার প্রতিটি প্রার্থনা সরাসরি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়। যারা হৃদয়ের গভীর থেকে এই রাতে হাত তোলে, তারা শূন্য হাতে ফিরে যায় না। তাই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে বিভোর হওয়ার পাশাপাশি ভুলে যাওয়া উচিত নয় এই রাতের মাহাত্ম্য। কেননা ঈদের রাত শুধু উৎসবের নয়—এ রাত হলো করুণা ও ক্ষমার, আত্মশুদ্ধি ও আত্মার প্রশান্তির। আল্লাহর নৈকট্য লাভের এমন সুযোগ আর কটিই বা আসে! ঈদের রাতের ফজিলত ও মর্যাদা ঈদের রাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতমণ্ডিত রাত, যা ‘লায়লাতুল জায়েজা’ বা ‘পুরস্কারের রাত’ নামে পরিচিত। কারণ রমজানের পুরো মাস রোজা রেখে, নামাজ পড়ে, কোরআন তিলাওয়াত করে, দান-সদকা করে আমরা যে আমলগুলো করেছি, এই রাতটি মূলত তার প্রতিদান লাভের সুযোগ তৈরি করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন ঈদের দিন আসে, ফেরেশতারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বলেন: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর দরবারে যাও, তোমাদের পুরস্কার গ্রহণ করো।’ (তাবারানি) ঈদের রাতে নফল ইবাদত করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মহাসুযোগ তৈরি হয়। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার রাতে ইবাদতের মাধ্যমে কাটাবে, কিয়ামতের কঠিন দিনেও তার অন্তর মরবে না, যেদিন ভয়ংকর ও বিভীষিকাময় পরিস্থিতির কারণে মানুষের অন্তর মারা যাবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৭৮২) ঈদের রাত এমন একটি রাত, যখন আল্লাহ বান্দাদের বিশেষভাবে দোয়া কবুল করেন। যারা আল্লাহর কাছে মন থেকে প্রার্থনা করে, তাদের দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পাঁচটি রাত রয়েছে, যেখানে দোয়া কবুল হয়—রজব মাসের প্রথম রাত, শাবানের ১৫তম রাত, জুমার রাত, ঈদুল ফিতরের রাত এবং ঈদুল আজহার রাত।’ (মুসনাদ আহমাদ) অর্থাৎ, এই রাতকে অবহেলা করা মানে একটি মহামূল্যবান সুযোগ হাতছাড়া করা।

ঈদের রাতের আমল

১. চাঁদ দেখে দোয়া পড়া

মহিমান্বিত পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ তথা নতুন চাঁদ দেখে দোয়া পড়া সুন্নত। তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) নতুন চাঁদ দেখলে এই দোয়াটি পাঠ করতেন—‘আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল ইয়ুমনি ওয়াল ইমান, ওয়াস সালামাতি ওয়াল ইসলাম; রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫২৬)

২. নফল নামাজ আদায় করা

ঈদের রাতে দুই বা চার রাকাত নফল নামাজ আদায় করলে অনেক সওয়াব পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও রাতে ইবাদতে ব্যস্ত থাকতেন। ঈদের রাতে নফল নামাজ আদায় করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মহাসুযোগ তৈরি হয়।

৩. কোরআন তিলাওয়াত করা

এই রাতে কোরআন তিলাওয়াত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। সুরা মুলক, সুরা আর-রহমান, সুরা ইয়াসিন ইত্যাদি তিলাওয়াত করা যেতে পারে।

৪. দোয়া ও ইস্তিগফার করা

এই রাতে বান্দার দোয়া কবুল হয়, তাই নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, মুসলিম উম্মাহর জন্য বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।

৫. তাকবির পড়া

‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’

ঈদের রাতে বেশি বেশি তাকবির বলা সুন্নাহ। এটি ঈদের রাতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। আনন্দ উদ্‌যাপনের পাশাপাশি যেন আমরা এই রাতের ফজিলত থেকে বঞ্চিত না হই। ঈদের রাতকে শুধু বিনোদনে কাটিয়ে দেওয়া মানে একটি অমূল্য সুযোগ হাতছাড়া করা। অন্তত কিছু সময় ইবাদতে কাটিয়ে এবং কোরআন তিলাওয়াত ও তাকবির পড়ে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করি যেন আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই সুন্দর হয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই বরকতময় রাতের পূর্ণ ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts