বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই রেমিট্যান্সকে কীভাবে টেকসইভাবে বহুগুণ বাড়ানো যায় এবং কীভাবে একে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব? বাস্তবতা হলো, এর কোনো শর্টকাট সমাধান নেই। বরং একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল প্রয়োজন, যার ভিত্তি হবে দুটি বিষয়—দক্ষ কর্মী প্রেরণ এবং শূন্য মাইগ্রেশন কস্ট নিশ্চিতকরণ।

এই দুই লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী রিভলভিং ফান্ড, সক্রিয় শ্রম কূটনীতি এবং প্রাইভেট সেক্টরের কার্যকর অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এ সমন্বয় ঘটাতে পারলেই ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন আর শুধু লক্ষ্য নয়, বরং একটি বাস্তব সম্ভাবনায় রূপ নিতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স শুধু একটি আয়ের খাত নয়; এটি দারিদ্র্য হ্রাস, গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেড়েছে, তবে বাস্তবতা হলো—বর্তমান কাঠামো ও গতানুগতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে রেমিট্যান্সকে বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব নয়। যদি বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে রেমিট্যান্সকে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে চায়, তাহলে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল প্রয়োজন।

এই কৌশলের মূলমন্ত্র দুটি—অধিকসংখ্যক কর্মী প্রেরণ এবং দক্ষ কর্মী প্রেরণ। এই দুই লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রেই সরকারের সক্রিয়, সমন্বিত ও নেতৃত্বমূলক ভূমিকা অপরিহার্য।

অধিকসংখ্যক কর্মী পাঠাতে হলে ডিমান্ড সংগ্রহে রাষ্ট্রকেই প্রাইভেট সেক্টরকে সহযোগিতা করতে হবে।

বিদেশে কাজের সুযোগ আপনা-আপনি আসে না—এটি একটি বড় ভুল ধারণা। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে শ্রমের চাহিদা সক্রিয়ভাবে সংগ্রহ করতে হয় আর এই কাজটি মূলত রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর।

বাস্তবতা হলো, আমাদের অনেক দূতাবাস এখনো শ্রম কূটনীতিকে তাদের মূল দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে না। কনস্যুলার সেবা, ভিসা ও পাসপোর্ট কার্যক্রমের মধ্যেই দূতাবাসের কাজ সীমাবদ্ধ থাকলে শ্রমবাজারে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়েই থাকবে। অথচ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে নির্মাণ, কেয়ারগিভিং, কৃষি, হসপিটালিটি এবং টেকনিক্যাল ট্রেডে বড় ধরনের জনবল সংকট রয়েছে।

এই সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হলে দূতাবাসগুলোকে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার, বড় নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, শিল্প সংগঠন ও চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ডিমান্ড তৈরি ও আনুষ্ঠানিক চুক্তি (MoU) সম্পাদন করতে প্রাইভেট সেক্টরকে সহযোগিতা হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ডিমান্ড নিশ্চিত না করলে বছরে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ানো সম্ভব নয়।

দক্ষ কর্মী পাঠানোই রেমিট্যান্স বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর পথ

তবে শুধু অধিক সংখ্যক কর্মী পাঠালেই রেমিট্যান্স টেকসইভাবে বাড়বে না। দক্ষ কর্মী পাঠিয়েই রেমিট্যান্স বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত উপায়। একজন অদক্ষ কর্মী যেখানে সীমিত আয় করেন, সেখানে একজন দক্ষ কর্মী একই দেশে দ্বিগুণ বা তিনগুণ আয় করতে পারেন। অর্থাৎ একই সংখ্যক কর্মী থেকেও রেমিট্যান্স বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব—যদি তারা দক্ষ হন।

এ কারণে স্কিল ডেভেলপমেন্ট, ভাষা শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশনকে অবশ্যই ডিমান্ড-ড্রিভেন করতে হবে। কোন দেশে কোন ট্রেডের চাহিদা, কোন ভাষা প্রয়োজন, কোন সার্টিফিকেশন গ্রহণযোগ্য—এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ না দিলে দক্ষতা কার্যকর হয় না। স্কিল ডেভেলপমেন্টকে প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

প্রাইভেট রিক্রুটিং এজেন্সি ও এমপ্লয়ার সংযোগে সরকারি উদ্যোগ জরুরি

বাস্তবে বিদেশে কর্মী পাঠানোর কাজটি করে থাকে বাংলাদেশের প্রাইভেট রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। কিন্তু উন্নত দেশের বড় নিয়োগদাতাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ, বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি এবং বড় চুক্তি সম্পাদনের সক্ষমতা অনেক এজেন্সির এককভাবে নেই। এখানেই সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দূতাবাস ও মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যদি নিয়মিত B2B ম্যাচমেকিং, আন্তর্জাতিক জব ফেয়ার এবং ডিজিটাল ডিমান্ড প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়, তাহলে প্রাইভেট সেক্টর অনেক বেশি স্বচ্ছ, দক্ষ ও দায়বদ্ধভাবে কাজ করতে পারবে। এতে একদিকে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়বে, অন্যদিকে অনিয়ম ও দালালনির্ভরতা কমবে।

জিরো মাইগ্রেশন কস্ট : একটি সরকারি রিভলভিং ফান্ডের প্রস্তাব

বিদেশগামী কর্মীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখনো মাইগ্রেশন কস্ট। একজন কর্মী বিদেশে যেতে গিয়ে গড়ে ৩ থেকে ৫/৭ লাখ টাকা ব্যয় করেন। এই ব্যয় অনেক সময় ধার, সুদ বা অনানুষ্ঠানিক ঋণের মাধ্যমে মেটাতে হয়, যা কর্মী ও তার পরিবারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে।

এ সমস্যা সমাধানে একটি বাস্তবসম্মত ও শক্তিশালী সমাধান হতে পারে—সরকারি রিভলভিং ফান্ড। বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করছে। এই এক বছরের রেমিট্যান্সের মাত্র ২৫ শতাংশ যদি মাত্র একবার একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় রিভলভিং ফান্ডে বরাদ্দ করা হয়, তাহলে প্রায় ৭-৮ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গড়ে তোলা সম্ভব। এই তহবিলের একমাত্র লক্ষ্য হবে—জিরো মাইগ্রেশন কস্টে কর্মী পাঠানো।

এই ফান্ড থেকে কর্মীর ভিসা, ট্রেনিং, ভাষা শিক্ষা, মেডিকেল ও বিমান ভাড়া আগাম পরিশোধ করা হবে। কর্মীকে কোনো টাকা দিতে হবে না, কোনো সুদ দিতে হবে না। পরে কর্মী বিদেশে গিয়ে যখন বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাবে, তখন একটি পূর্বনির্ধারিত পে-ব্যাক মেকানিজম অনুযায়ী তার আয়ের একটি ছোট অংশ (যেমন ৫-১০ শতাংশ) নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফান্ডে ফেরত যাবে। এতে কর্মীর ওপর বাড়তি চাপ পড়বে না, আবার ফান্ডও ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হবে। অন্যদিকে, ফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসবে দেশে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক।

এটি কোনো এককালীন অনুদান নয়; এটি একটি নিজে নিজে ঘুরতে থাকা (revolving) ব্যবস্থা। আজ যে টাকা দিয়ে একজন কর্মী পাঠানো হবে, কাল সেই কর্মীর রেমিট্যান্স দিয়েই আরেকজন কর্মী পাঠানো যাবে।

রেমিট্যান্স বাড়ানো কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটি একটি জাতীয় সমন্বিত উদ্যোগ—যেখানে সরকার ডিমান্ড আনবে ও নীতিগত সহায়তা দেবে, দূতাবাসগুলো হবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সংযোগকেন্দ্র, প্রাইভেট সেক্টর বাস্তবায়নের চালক হবে আর রাষ্ট্রীয় রিভলভিং ফান্ড নিশ্চিত করবে শূন্য মাইগ্রেশন কস্ট।

এই সমন্বয় ঘটাতে পারলেই বাংলাদেশ শুধু রেমিট্যান্স বাড়াতে পারবে না, বরং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে একটি দক্ষ, ন্যায্য ও বিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্রীয় ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts