ইরানের পাল্টা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামো পুনর্গঠনে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র ও আরব কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি গালফ দেশকে মার্কিন প্রকৌশল, উৎপাদন ও নির্মাণ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় এসব দেশের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় তাদের সম্ভাব্য গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সৌদি আরব ও ওমান তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের আলোচনায় গালফ দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব তুলে ধরছেন এবং পুনর্গঠনে সেই সম্পর্কের গুরুত্ব জোর দিয়ে বলছেন।

এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ, যেখানে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তবে এ উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। এক আরব কর্মকর্তা বলেন, এই প্রচেষ্টা কিছুটা বেখাপ্পা মনে হচ্ছে, কারণ অঞ্চলটি এখনও সম্ভাব্য নতুন সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র জ্বালানি খাত-সংক্রান্ত অবকাঠামো মেরামতেই উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে, যা ইরানের ক্ষয়ক্ষতির বাইরে। অন্যদিকে, ইরান নিজেই জানিয়েছে, যুদ্ধের ফলে তাদের অর্থনীতিতে সরাসরি ও পরোক্ষ মিলিয়ে প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলেও হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। এ পরিস্থিতিতে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারাই এখন ইরানের প্রভাবাধীন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে কুয়েত সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত দেশগুলোর একটি। দেশটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্যাম্প আরিফজান ও আলী আল-সালেম বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। এছাড়া কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

বাহরাইনেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া গেছে। দেশটির বন্দর, যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর অবস্থান করে, ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি আঘাত লেগেছে শিল্পখাতেও। অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং তেল শোধনাগার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে পুনর্গঠনের জন্য বিপুল অর্থ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। কুয়েতের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মূল্য প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার, যা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের তহবিলের সমপর্যায়ের।

এদিকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কারেন্সি সোয়াপ চুক্তিতে আগ্রহী, যাতে জ্বালানি রপ্তানি ব্যাহত হলে তারা ডলারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের আর্থিক সহযোগিতার বিনিময়ে এ অঞ্চল পুনর্গঠনে মার্কিন কোম্পানির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কৌশল নিতে পারে ওয়াশিংটন।

যদিও এখনো নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির পক্ষে আনুষ্ঠানিক লবিং শুরু হয়নি, তবে যুক্তরাষ্ট্র চায় উপসাগরীয় দেশগুলো পুনর্গঠনের সামনের সারিতে থাকুক তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলো এমনটাই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts