রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক যখন প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের পাহাড় নিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে, ঠিক তখনই এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যের বিশাল অঙ্কের সুদ মওকুফের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। অনলাইন গণমাধ্যম এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্যাংকটির মোট ঋণের ৭৩ দশমিক ১৮ শতাংশই এখন খেলাপি। এমন চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও ৪৪ কোটি টাকার এক ঋণখেলাপিকে প্রায় সাড়ে ২২ কোটি টাকা সুদ মাফ করে দিয়েছে জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা।
এই বিশেষ সুবিধা পাওয়া ব্যক্তিটি হলেন মির্জা ফয়সাল আমিন। তিনি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আপন ছোট ভাই এবং ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। এশিয়া পোস্টের নথিপত্র বিশ্লেষণ বলছে, গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে অস্বাভাবিক দ্রুততায় এই ফাইল নিষ্পত্তি করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
দুই দশকের ঋণ জট ও এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধান
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে দেখা যায়, মির্জা ফয়সালের মালিকানাধীন ‘নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ ২০ বছর আগে প্রথমবার জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। সেই ঋণ পরিশোধ না করেই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও ঋণ সুবিধা ভোগ করে। এশিয়া পোস্টের হাতে থাকা নথিপত্র বলছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র এক মাস আগে ২০০৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক প্রভাবে ১০ কোটি ৯৭ লাখ টাকার প্রকল্প ঋণ অনুমোদন করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তৎকালীন পর্ষদ পরিচালক মুহ. ফজলুর রহমান বর্তমানে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যার আমলেই এই ২২ কোটি টাকা মওকুফ করা হলো।
১৭ বছর বন্ধ কারখানায় হঠাৎ নগদ টাকার রহস্য
এশিয়া পোস্টের ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি সরজমিনে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো কারখানা পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, ২০১১ সাল থেকে এই কারখানাটি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে আছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এশিয়া পোস্টকে জানান, সারের ব্যবসা না হওয়ায় এক যুগ আগেই শ্রমিকরা চলে গেছে এবং কারখানাটি বর্তমানে ‘ডেড প্রজেক্ট’।
অথচ এশিয়া পোস্টের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুদ মওকুফের আবেদন করার ঠিক আগে গত নভেম্বরে হঠাৎ করেই ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ১৭ বছর বন্ধ থাকা একটি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ এত নগদ টাকা কোথায় পেল, তা নিয়ে গভীর রহস্য ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আইনি অপকৌশল ও সিআইবি জালিয়াতি
এশিয়া পোস্টের কাছে থাকা নথিপত্র অনুযায়ী, নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রোর মোট দায়ের পরিমাণ ৪৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এর মধ্যে ২২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা (প্রায় ৫০ শতাংশ) মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্যাংকিং রীতিনীতি তোয়াক্কা না করে এই দীর্ঘমেয়াদী খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে সিআইবি (CIB) রিপোর্টে ‘এসএমএ’ (ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু খেলাপি নয়) হিসেবে দেখানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র ব্যাংকার বলেন
“রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে ঋণের মানদণ্ড শিথিল করা এবং সিআইবিতে ভুল তথ্য দেওয়া গুরুতর অপরাধ। এটি নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে এবং ব্যাংকের মূলধনী ভিত্তিকে ধ্বংস করছে।”
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুজিবুর রহমান দাবি করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার মেনেই দ্রুত খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে, এশিয়া পোস্টের সাথে আলাপকালে মির্জা ফয়সাল আমিন দাবি করেন, তিনি বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে ব্যবসা করতে পারেননি। তবে এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের আমলেও তিনি ১১ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা নিয়েছিলেন।
ধ্বংসের মুখে জনতা ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য দিয়ে এশিয়া পোস্ট জানাচ্ছে, বেক্সিমকো, এস আলম ও এ্যাননটেক্সের মতো বড় গ্রুপগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে আছে জনতা ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ৪৮ হাজার ৩১ কোটি টাকা। এমন ভঙ্গুর অবস্থায় তড়িঘড়ি করে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে কোটি কোটি টাকা মওকুফ করায় জনতা ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।



