ভেনেজুয়েলায় সামরিক শক্তি ব্যবহারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করার লক্ষ্যে আনা একটি বিরল যুদ্ধক্ষমতা প্রস্তাব কার্যত ভেস্তে দিয়েছে মার্কিন সিনেটে রিপাবলিকানরা।
বুধবার তারা এমন পদক্ষেপ নেয়, যাতে করে প্রস্তাবটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই নাকোচ হয়ে যায়।

ওয়াশিংটন থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

গত সপ্তাহে এক ভোটে প্রস্তাবটি এগিয়ে গিয়েছিল। পাঁচজন রিপাবলিকান সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমর্থনে যোগ দেওয়ায় ট্রাম্পের জন্য এটি এক বড় ধাক্কা তৈরি করে। ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে ট্রাম্প যে সামরিক অভিযান চালান, তার পরই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়।

সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী কমিটির সদস্যদের না জানিয়ে ট্রাম্প অভিযানটি অনুমোদন দিয়েছিলেন, যে কারণে ওই ভোটকে অনেকেই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা অভিযানের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের ভর্ৎসনা হিসেবে দেখেন।

ভোটের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত পোষণকারীদের তীব্র আক্রমণ করেন। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউস প্রস্তাবটি ঠেকাতে জোরালো লবিং শুরু করে।

বুধবার সিনেটের রিপাবলিকানরা একটি প্রক্রিয়াগত কৌশল নেয়। তারা প্রস্তাবটির ‘বিশেষাধিকার’ মর্যাদা তুলে দেয়। এই মর্যাদা থাকলে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটেই প্রস্তাবটি পাস হতে পারত। রিপাবলিকানদের যুক্তি ছিল, কোনো যুদ্ধ চলমান না থাকায় এ নিয়ম এখানে প্রযোজ্য নয়।
এর ফলে চূড়ান্ত ভোটে প্রস্তাবটির পাস হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যা ৫৩ ও ডেমোক্র্যাটদের ৪৭। নতুন করে ৬০ ভোটের বাধ্যবাধকতা থাকায় ভোটের মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে এটিকে  এগিয়ে নেওয়ার মতো অবস্থা থাকে না।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিমোথি মাইকেল কেইন ( টিম কেইন) বলেন, ‘ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় তাঁর যুদ্ধ ন্যায্য। যদি তা-ই হয়, তাহলে কংগ্রেসে তিনি কেন মার্কিন জনগণের সামনে বিতর্ক ও ভোট এড়াতে নিজের দলকে চাপ দিয়ে প্রক্রিয়াগত কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন?’

ভার্জিনিয়ার এই সিনেটরই প্রস্তাবটির নেতৃত্ব দেন। ৩ জানুয়ারি কারাকাসে মার্কিন বিশেষ বাহিনী মাদুরোকে আটক করার পর তিনি বলেন, কংগ্রেসের সাংবিধানিক যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা পুনর্নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবটি পাস হলে ভেনেজুয়েলায় পরবর্তী কোনো সামরিক পদক্ষেপের আগে ট্রাম্পকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হতো।

মার্কিন গণমাধ্যম জানায়, গত সপ্তাহে সমর্থন দেওয়া পাঁচ রিপাবলিকানের মধ্যে দুজন শেষ পর্যন্ত অবস্থান বদলান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁদের আশ্বস্ত করেন যে, ভেনেজুয়েলায় স্থলবাহিনী পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা নেই এবং পরিস্থিতি বদলালে কংগ্রেসের সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ করা হবে।

প্রাথমিক ভোটের পর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ওই পাঁচজনকে ‘আর কখনোই নির্বাচিত হতে দেওয়া উচিত নয়।’

তবে প্রস্তাবটি সিনেটে পাস হলেও এর কার্যকারিতা মূলত প্রতীকীই থাকত। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে এটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই পরাজিত হতো। আর ট্রাম্প ভেটো দিলে তা অতিক্রম করতে দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন হতো।

ডেমোক্র্যাটরা এটিকে সংবিধান রক্ষার একটি স্পষ্ট সীমারেখা হিসেবে দেখান। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসন মাসের পর মাস বিভ্রান্তিকর ব্রিফিং দিয়েছে। এমনকি গত নভেম্বরেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, ভেনেজুয়েলার মাটিতে হামলার কোনো পরিকল্পনা নেই।

হোয়াইট হাউসের দাবি, এই অভিযান আইনগতভাবে বৈধ। এটি আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর অভিযানের অংশ। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে ভিন্নমত পোষণকারীরা শুরুতেই সতর্ক করেছিলেন যে, কংগ্রেস তার ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করলে এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র আরো গভীরভাবে জড়িয়ে পরতে পারে।

তবে ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে বলেন, তাঁদের এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাকে ‘গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ করছে এবং সর্বধিনায়ক হিসেবে তাঁর ক্ষমতা ব্যহত করছে।

এরপর তিনি সতর্ক করেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা বহু বছর ধরে চলতে পারে। এমনকি নিজেকে ‘ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে দেখানো একটি মিমও পোস্ট করেন তিনি।

ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর ভেনেজুয়েলা বিষয়ে যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব কংগ্রেসে চারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

গত একশ বছরে কেবল একবারই কংগ্রেসের উদ্যোগই বিদেশে প্রেসিডেন্টের একতরফা সামরিক ক্ষমতার ওপর স্থায়ী সীমা আরোপ করতে পেরেছে। সেটি হলো ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’, যা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ভেটো অতিক্রম করে পাস হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts