নিজস্ব প্রতিবেদক | আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা গুম, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি, ২০২৬) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন।
একই সঙ্গে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম হিসেবে প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য এবং সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আদালতে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ তুলে ধরেন, যার প্রতিটিতেই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা রয়েছে
১. গাজীপুরে প্রকাশ্য হত্যা (২০১১): ২০১১ সালের ১১ জুলাই জিয়াউল আহসানের সরাসরি উপস্থিতিতে গাজীপুরের পুবাইলে সজলসহ তিনজনকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়।
২. বলেশ্বর নদীতে ‘ক্লিন সুইপ’ (২০১০-২০১৩): বরগুনার পাথরঘাটার বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল ইসলাম মল্লিকসহ অন্তত ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। গভীর রাতে নৌকায় করে মাঝনদীতে নিয়ে বুক বা মাথায় বালিশ চেপে গুলি করে এবং লাশ যাতে ভেসে না ওঠে সেজন্য পেট কেটে সিমেন্টের ব্লক বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হতো। এই পদ্ধতিটি ‘গেস্টাপো’ কোড নামে পরিচিত ছিল।
৩. সুন্দরবনে সাজানো ‘বন্দুকযুদ্ধ’: তথাকথিত বনদস্যু দমনের নামে ‘অপারেশন নিশানখালী’ ও ‘অপারেশন মরা ভোলা’সহ বিভিন্ন অভিযানে অন্তত ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ। গুম থাকা ব্যক্তিদের বনদস্যু সাজিয়ে গভীর রাতে হত্যা করে সেটিকে বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হতো।
এর আগে গত ৮ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের আইনজীবীরা তাকে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন জানিয়েছিলেন। তাদের দাবি ছিল, প্রসিকিউশন জিয়াউলের সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো অকাট্য প্রমাণ দিতে পারেনি। তবে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া জবানবন্দি ও প্রাথমিক সাক্ষ্যপ্রমাণ পেশ করে জানান, আসামির বিরুদ্ধে অপরাধের ‘প্রাইমা ফেসি’ বা প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আজ আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
জিয়াউল আহসান ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট চাকরিচ্যুত হন। ১৬ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা ‘আয়নাঘর’ বা গোপন বন্দিশালায় নির্যাতন ও গুমের নেপথ্যে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং তার শত বিঘা জমি ও ব্যাংক হিসাব ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে।
১৯৯১ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া জিয়াউল আহসান র্যাব-২-এর উপঅধিনায়ক এবং পরবর্তীতে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ও এনএসআই-এর পরিচালক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।



