নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | বুধবার, ৭ জানুয়ারি ২০২৬
রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ আবাসিক এলাকায় গ্যাস সংকট এখন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। দিনের পর দিন চুলা না জ্বলায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন লাখ লাখ বাসিন্দা। তিতাসের লাইনে গ্যাস না থাকায় একদিকে যেমন রান্নাবান্না বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, অন্যদিকে এলপিজি সিলিন্ডারের বাজারে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, মোহাম্মদপুর, কাদেরাবাদ হাউজিং, যাত্রাবাড়ী, মাতুয়াইল, কাজলাপাড়, শনিরআখড়া ও মগবাজারের নয়াটোলাসহ বিশাল এলাকায় গ্যাস সরবরাহ প্রায় শূন্যের কোঠায়। এছাড়া মিরপুর, উত্তরা, রামপুরা ও বাড্ডার মতো এলাকাগুলোতেও দিনের বড় একটি অংশজুড়ে গ্যাসের কোনো চাপ থাকছে না।
পুরান ঢাকার নাজিরমহল্লা ও লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দারা জানান, রাত ১টার পর গ্যাস এলেও তা থাকে মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের জন্য। গভীর রাতে রান্নার এই যুদ্ধ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন গৃহিণীরা। শিশুদের স্কুলে পাঠানোর আগে ইলেকট্রিক চুলায় খাবার গরম করে বা ঠান্ডা খাবার খাইয়ে বিদায় দিতে হচ্ছে।
লাইনের গ্যাস না পেয়ে মানুষ যখন বিকল্প হিসেবে এলপিজির দিকে ঝুঁকছে, সেখানেও ব্যবসায়ীদের কারসাজি চরমে। নির্ধারিত ১,২৫৩ টাকার সিলিন্ডার কোথাও কোথাও ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাড়তি দাম দিয়েও অনেক সময় মিলছে না প্রয়োজনীয় গ্যাস। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর মাসিক খরচের হিসাব পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে গেছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যে পরিমাণ গ্যাস সিস্টেম লস বা অপচয় হয়েছে, তা দিয়ে প্রায় ৩০ লাখ চুলা এক বছর তিন বেলা জ্বালানো সম্ভব ছিল।
- অপচয়ের পরিমাণ: ১,৭৯৬ মিলিয়ন ঘনমিটার।
- আর্থিক ক্ষতি: প্রায় ৪,১০৭ কোটি টাকা। মূলত গ্যাস চুরি, অবৈধ সংযোগ, পুরোনো পাইপলাইনে ছিদ্র এবং মিটারিং ত্রুটির কারণেই এই বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
পেট্রোবাংলার ৫ জানুয়ারির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ও সরবরাহ অনেক কম।
- বিদ্যুৎ খাত: ২৫২ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ৭৪.৮৬ কোটি ঘনফুট।
- সার কারখানা: ৩২.৯০ কোটি ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ ২৩.৪৩ কোটি ঘনফুট।
- আবাসিক খাত: মোট উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশ গ্যাস আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়, যা বর্তমান জনসংখ্যার তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল।
দীর্ঘদিন ধরে বাইরের হোটেলের অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং তীব্র শীতে ঠান্ডা পানি ব্যবহারের ফলে বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। মিরপুরের বাসিন্দা রেবা রেহানা বলেন, “অসুস্থ মায়ের জন্য গরম পানিটুকু করার গ্যাস নেই। গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করাও সম্ভব নয়। বাইরে থেকে চড়া দামে খাবার কিনে ক্ষুধা নিবারণ করতে হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং পুরোনো পাইপলাইন দ্রুত সংস্কার না করলে এই সংকটের সমাধান অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব নয়।



