ফজলুর রহমান ১ জানুয়ারি ২০২৬
সময়টা ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫। বাংলাদেশের রাজনীতির মহীরুহ, গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী এবং তিন মেয়াদের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর এই চলে যাওয়া কেবল একটি রাজনৈতিক শূন্যতা নয়, বরং একটি আদর্শিক যুগের অবসান। সাধারণ গৃহবধূ থেকে বাংলার ‘দেশনেত্রী’ হয়ে ওঠার যে কণ্টকাকীর্ণ পথ তিনি পাড়ি দিয়েছেন, তা সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতেও বিরল।
১৯৪৫ সালে জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম পুতুলের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দিনাজপুরের শান্ত পরিবেশে। ১৯৬০ সালে সেনাসদস্য জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তিনি নিভৃতচারী গৃহবধূ হিসেবেই জীবন কাটাতেন। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক বিয়োগান্তক ঘটনায় স্বামী হারানো এবং দলীয় সংকটে তাঁর জীবন আমূল বদলে যায়। ১৯৮২ সালে যখন বিএনপি ভাঙনের মুখে, তখন নেতা-কর্মীদের প্রাণের দাবিতে তিনি রাজনীতিতে পা রাখেন। ১৯৮৪ সালে দলের হাল ধরার পর তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি।
আশির দশকের পুরোটা সময়জুড়ে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বেগম জিয়া ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। যখন অনেক রাজনৈতিক শক্তি আপস করে নির্বাচনে যাচ্ছিল, তখন তিনি রাজপথে স্লোগান দিয়েছেন। বন্দি হয়েছেন বারবার, গৃহবন্দী করা হয়েছে তাঁকে মাসের পর মাস। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে সবসময় ছিল এক দাবি—‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে তাঁর অবিচল নেতৃত্বই এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছিল। দেশবাসী তাঁকে ভূষিত করেছিল ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধিতে।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি প্রমাণ করেন তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে।
- শিক্ষা বিপ্লব: নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। মেয়েদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করে তিনি গ্রামাঞ্চলের চিত্র বদলে দিয়েছিলেন।
- অবকাঠামো ও অর্থনীতি: যমুনা বহুমুখী সেতুর বাস্তবায়ন এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রসার তাঁর আমলেই গতি পায়। তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি ‘শান্তি ও সমৃদ্ধির’ মডেল গড়ে তোলেন।
২০০৯ সাল পরবর্তী সময়টি ছিল বেগম জিয়ার জীবনের সবচেয়ে ট্র্যাজিক অধ্যায়। শেখ হাসিনা সরকার তাঁকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেছিল।
- বাসভবন থেকে উচ্ছেদ: ২০১০ সালে মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে মইনুল রোডের ৪০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে তাঁকে বের করে দেওয়া হয়। এক কাপড়ে অশ্রুসিক্ত চোখে তাঁর বিদায়ের দৃশ্য আজও কোটি সমর্থকের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়।
- আদালত ও কারাগারের জীবন: ২০১৮ সালে এক বিতর্কিত রায়ে তাঁকে জেলে পাঠানো হয়। নাজিমুদ্দিন রোডের স্যাঁতসেঁতে পুরোনো কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে তাঁকে রাখা হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ‘মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন’ বলে অভিহিত করেছিল।
- চিকিৎসায় বাধা ও অমানবিকতা: কারাবন্দী অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। লিভার সিরোসিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর মেডিকেল বোর্ড তাঁকে বিদেশে পাঠানোর সুপারিশ করলেও হাসিনা সরকার তা বারবার নাকচ করে দেয়। অভিযোগ আছে, চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে তাঁকে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
রাজনীতির বাইরেও মা হিসেবে তাঁকে চরম পরীক্ষা দিতে হয়েছে। ২০১৫ সালে প্রবাসে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যুতে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। তখন তিনি নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ ছিলেন। নিজের সন্তানের শেষ জানাজায় যাওয়ার অধিকারটুকুও সেদিন পূর্ণভাবে পাননি তিনি। বড় ছেলে তারেক রহমান প্রবাসে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। এই পর্বতসম শোক বুকে চেপেই তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গণতন্ত্রের কথা ভেবেছেন।
জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি গুলশানের ‘ফিরোজা’ বাসভবনে কার্যত বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। অসুস্থতা যখন তাঁকে গ্রাস করছিল, তখনও তাঁর আদর্শে কোনো ফাটল ধরেনি। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারিয়েছে তার সবচেয়ে সাহসী অভিভাবককে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ এবং ‘ইসলামি মূল্যবোধের’ যে রাজনীতি, তা দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর মনে চিরস্থায়ী আসন গেড়েছে।
বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি একটি ত্যাগের নাম, একটি সংগ্রামের প্রতীক। বাংলাদেশের ইতিহাস যখনই লেখা হবে, তখন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় নারী হিসেবে তাঁর নাম সবার আগে আসবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি তাঁকে শারীরিক কষ্ট দিলেও তাঁর রাজনৈতিক উচ্চতাকে ছুঁতে পারেনি। তিনি কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন তাঁর ‘আপসহীন’ প্রতিচ্ছবি হয়ে।



