বাংলাদেশের রাজনীতির চিরচেনা সমীকরণ কি বদলে যাচ্ছে? এক সময় যে দলটিকে এড়িয়ে চলাই ছিল অঘোষিত নিয়ম, সেই জামায়াতে ইসলামীর প্রধান কার্যালয় বা আমিরের বাসভবনে এখন বিদেশি কূটনীতিক আর দেশের অভিজাত শ্রেণির ভিড়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

‘অস্পৃশ্য’ থেকে ‘দাদু’: ইমেজের ভোলবদল

মাত্র কয়েক মাস আগেও আন্তর্জাতিক মহলে অনেকটা ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে বিবেচিত ডা. শফিকুর রহমান এখন পশ্চিমা এবং ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে প্রকাশ্য বৈঠকে বসছেন। এমনকি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে জামায়াত নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোকে নজিরবিহীন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

তবে কূটনীতিকদের ড্রয়িংরুমের চেয়েও বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে রাজপথে। বর্তমান প্রজন্মের ‘জেন-জি’ তরুণদের কাছে ডা. শফিকুর রহমান এখন পরিচিত ‘দাদু’ হিসেবে। সাদা দাড়ি আর শান্ত স্বভাবের এই চিকিৎসক নেতা তরুণদের সঙ্গে কথা বলছেন গভীর মমতায়। চট্টগ্রামের তরুণ সমর্থক আবদুল্লাহ আল মারুফ বলছিলেন, “অন্য নেতারা যখন আমাদের তাচ্ছিল্য করেন, শফিকুর রহমান তখন আমাদের সঙ্গে কথা বলেন পরম সম্মানে। উনার মধ্যে দাদু আর নাতি-নাতনির সম্পর্কের মতো এক ধরনের উষ্ণতা আছে।”

চ্যালেঞ্জ ও উচ্চাভিলাষী ইশতেহার

সম্প্রতি জামায়াত একটি উচ্চাভিলাষী নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ঢাকার অর্থনীতিবিদদের অনেকে এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি আসলে জামায়াতের আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশের শাসন করার রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের প্রকাশ। প্রথমবারের মতো একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে দলটি তাদের ‘কট্টরপন্থি’ ইমেজ ঝেড়ে ফেলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের মতে, এই পুনরুত্থান হঠাৎ করে হয়নি। বন্যা, কোভিড কিংবা জুলাই বিপ্লবের সময় তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের পাশে থাকা এবং চরম দমন-পীড়নের মাঝেও টিকে থাকার লড়াইয়ের ফসল এটি।

পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কি ডা. শফিকুর রহমান?

আল জাজিরার প্রতিবেদনে একটি সাহসী প্রশ্ন তোলা হয়েছে—শফিকুর রহমান কি হতে পারেন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী? যে নেতার দল দুই বার নিষিদ্ধ হয়েছিল, আজ সেই দলই জনমত জরিপে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

২০২২ সালে ‘জঙ্গিবাদে সহায়তার’ অভিযোগে ১৫ মাস কারাবাসের পর মুক্তি পাওয়া এই নেতার সংযত আচরণ এখন সবার নজর কাড়ছে। জুলাইয়ের উত্তপ্ত রাজপথে অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারানোর পরও চিকিৎসকদের নিষেধ উপেক্ষা করে তার বক্তব্য শেষ করার ঘটনাটি সমর্থকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের ভাবনা

জামায়াত কি সত্যিই বদলেছে, নাকি এটি কেবলই কৌশলগত অবস্থান? ডা. শফিকুর রহমানের সহযোগী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের দাবি, জামায়াত একটি মধ্যপন্থি দল এবং তারা কারো ওপর ধর্মীয় আইন চাপিয়ে দেবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের ঐতিহ্যগত সমর্থকদের আনুগত্য ধরে রেখে আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা অর্জন করাটাই হবে ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তবে ঢাকার ভোটার আবুল কালামের মতো সাধারণ মানুষের আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট, “তিনি যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, তিনি একজন দেশপ্রেমিক এবং আমাদের ভালো নেতৃত্ব দেবেন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts