মোঃ সাব্বির ইসলাম, রংপুর প্রতিনিধি
চাঁদ দেখার মাধ্যমে পবিত্র রমাদ্বান মাসের সূচনা হয় এবং সারা বিশ্বে মুসলমানরা সিয়াম (রোজা) পালনের মাধ্যমে আত্মসংযম, ধৈর্য ও নৈতিকতার অনুশীলন করেন। রোজা শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা থেকে বিরত থাকা নয়; এটি মানুষের চরিত্র, চিন্তা ও আচরণকে শুদ্ধ করার এক আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ।
রোজার ফরজ হওয়া এবং মূল উদ্দেশ্য কি?
রমাদ্বানের রোজা মুসলমানদের উপর ফরজ। পবিত্র আল-কুরআন এ আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।”
— (সূরা আল-বাকারা: ১৮৩)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে রোজার প্রধান উদ্দেশ্য তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন—যা মানুষের নৈতিক উন্নতির ভিত্তি।
এই মাস কুরআন নাযিলের মাস,রমাদ্বানের বিশেষ মর্যাদা এই কারণে যে এ মাসেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ
“রমাদ্বান মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন—মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্য-মিথ্যার স্পষ্ট প্রমাণ।”
— (সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)
এ কারণে রমাদ্বানে কুরআন তিলাওয়াত, অর্থ বোঝা ও তা জীবনে প্রয়োগের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রোজার ফজিলত ও প্রতিদান কি?
ইসলামের মহানবী রাসুলুল্লাহ মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন:
كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصِّيَامَ فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ
“মানুষের প্রতিটি আমল তার নিজের জন্য; তবে রোজা ব্যতিক্রম। রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব।”
— (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
আরেক হাদীসে এসেছে:
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِن ذَنْبِهِ
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমাদ্বানের রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।”
— (সহীহ বুখারী)
তারাবি, দান-সদকা ও সামাজিক সহমর্মিতার মাস:রমাদ্বান ইবাদতের মাস। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি তারাবি আদায় করা হয়, যা আধ্যাত্মিক অনুশীলনকে গভীর করে। একই সাথে দান-সদকা, যাকাত ও অসহায়দের সাহায্য করার মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়। ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করে মানুষ অন্যের দুঃখ উপলব্ধি করতে শেখে—এটাই রমাদ্বানের সামাজিক শিক্ষা।
বিশ্বের নানা প্রান্তে মুসলমানরা মসজিদকেন্দ্রিক ইবাদতে অংশ নেন; বিশেষত মসজিদুল হারাম-এ রমাদ্বানের ইবাদতের দৃশ্য বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক।
লাইলাতুল কদরের মর্যাদা:
রমাদ্বানের শেষ দশ দিন অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এই সময়েই রয়েছে মহিমান্বিত লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ
“লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।”
— (সূরা আল-কদর: ৩)
এই রাতে ইবাদত, দোয়া ও তওবার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর বিশেষ রহমত লাভের আশা করে।
রমাদ্বান শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, নৈতিক উন্নতি ও মানবকল্যাণের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। সংযম, ধৈর্য, সহমর্মিতা ও আল্লাহর স্মরণ—এই চারটি ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রমাদ্বান মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে। এ মাসের সাধনার পর ঈদুল ফিতরের আনন্দ মানুষকে কৃতজ্ঞতা, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির বার্তা পৌঁছে দেয় সমগ্র মানবসমাজে।



