রমাদ্বান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য সংযম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির মাস। এই পবিত্র সময়েই যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তা দ্বিগুণ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে সিয়াম পালন, অন্যদিকে পরিবারের খাদ্যসংস্থান এই দ্বৈত চাপ তাদের জীবনে অসহনীয় বোঝা হয়ে ওঠে। প্রশ্ন জাগে—এমন অবস্থা কি ইসলামের ন্যায় ও মানবিকতার আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
অথচো ইসলামে ন্যায়সঙ্গত ব্যবসা-বাণিজ্য করার আদেশ করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ন্যায়ভিত্তিক লেনদেনের ওপর জোর দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন:
“তোমরা পরিমাপে পূর্ণ দাও এবং ওজনে কম দিও না।”
— (সূরা আল-আন‘আম: ১৫২)
আরেক স্থানে বলা হয়েছে:
“ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়।”
— (সূরা আল-মুতাফ্ফিফীন: ১)
এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে যে ব্যবসায় প্রতারণা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অন্যায় ও গর্হিত কাজ।
হাদীসেও মূল্যবৃদ্ধি-মজুতদারির নিন্দা করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) সমাজে কষ্ট সৃষ্টি করে এমন অর্থনৈতিক আচরণ কঠোরভাবে নিন্দা করেছেন।
তিনি বলেন:
“যে ব্যক্তি মজুতদারি করে, সে পাপী।”(সহিহ মুসলিম)
আরেক হাদীসে এসেছে:
“যে ব্যক্তি মুসলমানদের কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাকে কষ্ট দেবেন।”
— (আবু দাউদ)
অর্থাৎ মানুষের প্রয়োজনীয় দ্রব্য আটকে রেখে বা অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করে লাভবান হওয়া ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।
রমাদ্বান সহমর্মিতা ও দানের মাস।রমাদ্বানের মূল শিক্ষা হলো ক্ষুধার্ত মানুষের কষ্ট অনুভব করা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো।
কুরআনে বলা হয়েছে:
“তোমরা সৎকর্মে ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা কর।”
— (সূরা আল-মায়িদাহ: ২)
রাসূলুল্লাহ (সা.) রমাদ্বানে ছিলেন সর্বাধিক দানশীল। তিনি দরিদ্রদের সাহায্য করতে এবং তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা করতে উৎসাহ দিয়েছেন। দ্রব্যমূল্যের অযৌক্তিক বৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক সংকট। ব্যবসায়ী, প্রশাসন এবং সমাজের বিত্তবান মানুষ সবারই দায়িত্ব রয়েছে যেন দরিদ্র মানুষ রমাদ্বানে সম্মানের সাথে জীবনযাপন করতে পারে।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী:
- বাজারে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা
- দরিদ্রদের সহায়তা করা
- মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট বন্ধ করা
— এগুলো শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, ইবাদতের অংশও বটে। মানবিকতার আহ্বান!রমাদ্বান আত্মসংযমের মাস, অতিরিক্ত সম্পদ লাভের প্রতিযোগিতার মাস নয়। যখন সমাজের একটি অংশ ইফতারের খাদ্য জোগাড় করতে হিমশিম খায়, তখন অন্যদের দায়িত্ব তাদের পাশে দাঁড়ানো। ইসলাম এমন এক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায় যেখানে কেউ অভুক্ত থাকবে না এবং কেউ অন্যের কষ্টকে পুঁজি করে লাভবান হবে না রমাদ্বানের পবিত্রতা রক্ষা করতে হলে শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিকতার চর্চা। দ্রব্যমূল্যের অযৌক্তিক বৃদ্ধি বন্ধ করে, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এবং ইসলামের ন্যায়ের আদর্শ বাস্তবায়ন করেই আমরা রমাদ্বানের প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করতে পারি। সমাজের প্রতিটি স্তরে যদি এই সচেতনতা গড়ে ওঠে, তবে রমাদ্বান হবে সত্যিকার অর্থেই রহমত, বরকত ও সহমর্মিতার মাস।
মোঃ সাব্বির ইসলাম



