এম এ কাহার সিদ্দিক, কুড়িগ্রাম | ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় ফসলি জমি ও নদীর পাড় রক্ষায় ‘মাটিখেকো’ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে নেমেছে উপজেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দিবাগত গভীর রাতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং অবৈধ কাজে ব্যবহৃত দুটি ট্রাক্টর জব্দ করেছে। প্রশাসনের এই আকস্মিক অভিযানে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী মহল রাতের আঁধারে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে আসছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে উপজেলার তবকপুর ইউনিয়নের উমানন্দ কারিপাড়া এলাকায় অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত।

সেখানে দেখা যায়, একদল শ্রমিক ও ব্যবসায়ী অবৈধভাবে কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি (Top Soil) কেটে সাবাড় করছে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে মাটি উত্তোলনের মূল হোতা আল আরাফাত হোসেনকে হাতেনাতে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক তাকে ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ এর ৭ক(গ) ধারা লঙ্ঘনের দায়ে ১৫ ধারায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য হন।

একই রাতে দ্বিতীয় অভিযানটি পরিচালিত হয় উলিপুর পৌরসভার ব্র্যাক অফিসের পেছনে বুড়িতিস্তা নদীর পাড় সংলগ্ন এলাকায়। নদীর পাড় ও তীরবর্তী এলাকা থেকে মাটি পরিবহনের দায়ে রাকিব নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তাকে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এছাড়া অভিযান চলাকালে দুর্গাপুর ইউনিয়ন ও উলিপুর পৌরসভার চিলমারী সড়কের পাশ থেকে মাটি বহনের কাজে ব্যবহৃত দুটি বড় ট্রাক্টর জব্দ করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।

উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃষকদের প্রলোভন দেখিয়ে জমির উর্বর মাটি কেটে নিচ্ছে। এতে জমির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মরুকরণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে বুড়িতিস্তা নদীর পাড় থেকে মাটি কাটায় বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এসব অনিয়ম বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে প্রশাসন।

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অবৈধ কারবারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের এমন সাহসী পদক্ষেপে সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলে স্বস্তি ফিরেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, “মাটিখেকো এই চক্রটি অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পেত না। রাতের বেলায় ট্রাক্টরের বিকট শব্দে মানুষের ঘুম নষ্ট হতো এবং গ্রামীণ রাস্তাগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছিল। প্রশাসনের এই অভিযান নিয়মিত চললে আমাদের কৃষি ও পরিবেশ রক্ষা পাবে।”

উলিপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জনস্বার্থ ও পরিবেশ রক্ষায় এ ধরনের অভিযান কোনো তদ্বির বা চাপের মুখে বন্ধ হবে না। ভবিষ্যতে যারা ফসলি জমির শ্রেণি পরিবর্তন বা নদীর পাড় থেকে মাটি কাটবে, তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts